ম্যারাডোনা থেকে মেসি, বাংলাদেশিরা কেন আর্জেন্টিনা ফুটবলে মগ্ন?

0
ম্যারাডোনা থেকে মেসি, বাংলাদেশিরা কেন আর্জেন্টিনা ফুটবলে মগ্ন?

দূরত্ব প্রায় ১৭ হাজার কিলোমিটার। অথচ লাতিন আমেরিকার দেশ আর্জেন্টিনার ফুটবল ম্যাচকে কেন্দ্র করে যে উন্মাদনা, তা দেখলে মনে হতেই পারে এটি বুঝি বুয়েনস আইরেসেরই কোনো চত্বর। দীর্ঘ চার দশক ধরে ফুটবল বিশ্বকাপের মঞ্চে লালিত এই ভালোবাসা আজ রূপ নিয়েছে এক অনন্য ঐতিহ্যে। ১৯৮৬ সালে দিয়াগো ম্যারাডোনার হাত ধরে যে আবেগের বীজ বুনেছিল এই দেশের মানুষ, তা আজ লিওনেল মেসির জাদুতে নতুন প্রজন্মের মাঝে এক মহীরুহে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ কখনো বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে না পারলেও প্রতি চার বছর পর পর আলবিসেলেস্তেদের সমর্থনে পুরো দেশ যেন মেতে ওঠে এক নীল-সাদা উৎসবে।

বিশ্বকাপের মঞ্চে আর্জেন্টিনার প্রতিটি ম্যাচকে কেন্দ্র করে ঢাকার বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে শুরু করে পাড়া-মহল্লায় বসানো হচ্ছে জায়ান্ট স্ক্রিন। গভীর রাতে ম্যাচ হলেও দর্শকদের ভিড় আর ভুভুজেলা বাঁশির আওয়াজে মুখরিত হয়ে উঠছে চারপাশ। বয়স্ক ফুটবলপ্রেমীদের মতে, এই ভালোবাসার শুরুটা হয়েছিল ম্যারাডোনার একক নৈপুণ্য এবং ফকল্যান্ড যুদ্ধের পর ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে আর্জেন্টিনার সেই ঐতিহাসিক জয় থেকে। পরবর্তীতে ১৯৯০ সালের ফাইনালে ম্যারাডোনার কান্না সাধারণ বাংলাদেশিদের হৃদয় ছুঁয়ে যায়, যা এই সমর্থনকে আরও স্থায়ী রূপ দেয়। এরপর ২০২২ সালে কাতারে মেসির হাতে বিশ্বকাপের ট্রফি ওঠার পর ভক্তদের দীর্ঘ ৩৬ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটে এবং সেই ধারাবাহিকতা চলছে বর্তমান বিশ্বকাপেও।

এই ফুটবল উন্মাদনা শুধু মাঠের খেলাতেই সীমাবদ্ধ নেই বরং তা রূপ নিয়েছে কূটনৈতিক সাফল্যে। ২০২২ বিশ্বকাপে বাংলাদেশি সমর্থকদের এই বাঁধভাঙা উল্লাস বিশ্ববাসীর নজর কাড়ার পর, দীর্ঘ ৪৫ বছর পর ঢাকায় পুনরায় নিজেদের দূতাবাস চালু করেছে আর্জেন্টিনা সরকার। দেশটির রাষ্ট্রদূত স্বয়ং ঢাকার বিভিন্ন পাবলিক স্ক্রিনিংয়ে সাধারণ সমর্থকদের সাথে বসে খেলা দেখছেন, যা দুই দেশের মানুষের মধ্যকার সম্পর্ককে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। ঘরে ঘরে এখন এই ফুটবল নিয়ে তৈরি হয় খুনসুটি, যেখানে বাবা আর্জেন্টিনা তো মা ব্রাজিল সমর্থক। এমনকি প্রিয় ফুটবলারের নামে পোষা বিড়ালের নাম মেসি রাখার মতো ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশও দেখা যায় এখানে।

তবে এই আকাশচুম্বী উন্মাদনার সমান্তরালে দেশের ফুটবলপ্রেমীদের মনে এক বড় আক্ষেপও রয়ে গেছে। ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে পেছনের সারিতে থাকা বাংলাদেশের ফুটবল নিয়ে ক্রীড়া বিশ্লেষক ও সাবেক কোচদের মনে প্রশ্ন জাগে, কেন এই বিপুল উদ্দীপনা দেশের ফুটবলের উন্নয়নে কাজে লাগানো যাচ্ছে না। পর্যাপ্ত মাঠ, আধুনিক একাডেমি ও সঠিক পরিকল্পনার অভাবে তরুণ ফুটবলাররা তাদের প্রতিভা বিকাশের পথ খুঁজে পাচ্ছে না বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। ক্রিকেটের মতো ফুটবলেও যদি সঠিক বিনিয়োগ ও দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপ তৈরি করা যায়, তবে হয়তো একদিন এই দেশের মানুষ নিজেদের লাল-সবুজ পতাকার জন্যও একইভাবে গর্জে উঠতে পারবে বলে আশা প্রকাশ করেন ফুটবল সংশ্লিষ্টরা।

সূত্র: আল জাজিরা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here