মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক আচরণ ও নীতিগত অবস্থানের পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে অনুষ্ঠিতব্য আসন্ন ‘ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ’ বর্জনের ডাক ক্রমশ জোরালো হচ্ছে।
ভেনেজুয়েলার মতো মেক্সিকোতেও সামরিক অভিযানের হুমকি, ভিসা ইস্যুর ফি বৃদ্ধি এবং ননইমিগ্র্যান্ট ভিসাধারীদের বিরুদ্ধে প্রতিদিন ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন নতুন সতর্কতামূলক আদেশ জারির প্রেক্ষাপটে ফুটবলপ্রেমীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই বর্জনের আহ্বান জানাচ্ছেন।
উল্লেখ্য, টিকিটের অস্বাভাবিক মূল্য নির্ধারণের কারণে কয়েক সপ্তাহ ধরেই বিভিন্ন দেশের ফুটবলভক্তরা যুক্তরাষ্ট্রে না আসার কথা ভাবছিলেন। ইতোমধ্যে অসংখ্য মানুষ ফিফা কর্তৃপক্ষের কাছে স্টেডিয়ামে প্রবেশমূল্য হ্রাসের আবেদন জানিয়েছেন। এসব আলোচনা ও সমালোচনার মধ্যেই গত ৩ জানুয়ারি ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযান চালিয়ে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করে নিউইয়র্কের ইস্টার্ন ডিস্ট্রিক্ট ফেডারেল কোর্টে সোপর্দ করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে মাদক সন্ত্রাসের গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। এই ঘটনায় গণতান্ত্রিক বিশ্বসহ জাতিসংঘেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়।
এতকিছু সত্ত্বেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আরও একধাপ এগিয়ে প্রকাশ্যে মেক্সিকোতেও সামরিক অভিযানের হুমকি দেন। তিনি দাবি করেন, মেক্সিকোতে আন্তর্জাতিক মাদক সম্রাটদের অবস্থান রয়েছে এবং তারা যুক্তরাষ্ট্রে মাদক পাচার করছে, যা আমেরিকানদের দৈনন্দিন জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। একইসঙ্গে কলম্বিয়া, ইরান এবং গ্রিনল্যান্ড দখলের অভিপ্রায়ও ব্যক্ত করেন তিনি। সব মিলিয়ে গোটা বিশ্বকে অস্থির করে তুলতে পারে- এমন বক্তব্য ও অবস্থান নিচ্ছেন ট্রাম্প।
এদিকে অভিবাসনবিরোধী চলমান অভিযানে মার্কিন সমাজব্যবস্থায় আতঙ্কের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সিটিজেনশিপ প্রক্রিয়ায় থাকা অভিবাসীরাও স্বস্তিতে নেই। গত বৃহস্পতিবার মিনেসোটায় ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন পুলিশের অমানবিক তৎপরতার প্রতিবাদ চলাকালে আইস (ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট)-এর এক এজেন্টের গুলিতে মিনিয়াপলিস শহরে কবি, লেখক ও মানবাধিকারকর্মী রিনী গুড নিহত হওয়ার পর দেশজুড়ে তীব্র আন্দোলন শুরু হয়।
বিশ্বকাপ ফুটবলের সর্বশেষ আসর ২০২২ সালে কাতারের দোহায় অনুষ্ঠিত হয়। করোনা পরবর্তী সময়ে সারাবিশ্ব থেকে ৩৪ লাখেরও বেশি ফুটবলপ্রেমীর সমাগম ঘটেছিল সেখানে। ফলে ফিফা বিশ্বকাপ কেবল বিনোদনের আয়োজনই নয়, বরং স্বাগতিক দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার অন্যতম প্রধান অবলম্বন হিসেবেও বিবেচিত। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে অনুষ্ঠিতব্য আসন্ন ফিফা বিশ্বকাপ ঘিরে বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে। ফিফা সূত্রে জানা গেছে, ইতোমধ্যে অসংখ্য মানুষ ভিসার আবেদন করেছেন এবং হোটেল বুকিংও সম্পন্ন করেছেন।
তবে ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন পদক্ষেপে কানাডা ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বিরূপ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। মেক্সিকোর সঙ্গে বিদ্যমান সম্পর্কও ভেঙে পড়ার পথে। একই সঙ্গে লাতিন আমেরিকা, এশিয়া ও ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশ গভীর উদ্বেগে পড়েছে। এসব কারণে ফুটবলপ্রেমীরা যুক্তরাষ্ট্র সফরের আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন বলে শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) শীর্ষস্থানীয় মার্কিন গণমাধ্যমগুলোতেও সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।
এদিন আরও জানানো হয়, পর্যটকদের কাছে সবচেয়ে জনপ্রিয় পার্কগুলোতে টিকিটের মূল্য কয়েক গুণ বাড়ানো হচ্ছে। এমনকি এসব পার্কে প্রবেশের সময় সকলের পরিচয়পত্র প্রদর্শন বাধ্যতামূলক করা হবে। যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তকেও ফুটবলপ্রেমীদের ক্ষোভের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’-এ প্রায় পাঁচ লাখ অনুসারী রয়েছে ‘প্যাট্রিয়টিক ভিশন’ নামের একটি বেসরকারি সংস্থার। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ সাফা জানিয়েছেন, তিনি ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রে ফিফা বিশ্বকাপের টিকিট বাতিল করেছেন। তার আশঙ্কা, ফুটবল দেখতে বিভিন্ন শহরে যাতায়াতের সময় আইসের অযথা হয়রানির শিকার হতে হবে। তিনি মন্তব্য করেন, ট্রাম্প প্রশাসনের আচরণ কোনোভাবেই পর্যটকদের নিরাপদ ভ্রমণের অনুকূলে নয়।
গ্রিন পার্টি থেকে নির্বাচনে অংশ নেওয়া বামপন্থি রাজনীতিক আজামু বারাকা বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি নিজেই নিজেকে বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করতে চায়, তাহলে অবশিষ্ট বিশ্ব কেন যুক্তরাষ্ট্রকে বর্জন করবে না। ফিফা বর্জনের মাধ্যমেই সেটি দৃশ্যমান করা যেতে পারে।
এদিকে সাবেক ফেডারেল আইনজীবী নাফির আফজাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’-এ লিখেছেন, ফিফা শান্তি পুরস্কার পাওয়ার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যেভাবে ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযান চালিয়েছেন এবং গ্রিনল্যান্ড, মেক্সিকো, কলম্বিয়া ও ইরানে অভিযানের হুমকি দিয়েছেন, সেই সঙ্গে ইমিগ্রেশন পুলিশের গুলিতে নিরস্ত্র লেখিকা ও যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক রিনী গুড নিহত হওয়ার ঘটনায় কেউই স্বস্তিতে নেই। তার মতে, এখনই ফিফা বর্জনের সময়।

